রবিবার ১২ জুলাই ২০২৬ - ২০:৩২
শিশুদের আক্রমণাত্মক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ মোকাবিলায় করণীয়

শিশুদের ‘দুষ্টু’ বলে আখ্যায়িত করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ইরানের পারিবারিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ত্রাশিয়ুন। তাঁর মতে, শিশুদের আক্রমণাত্মক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। পরিবার, বিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধাপে ধাপে শিশুর আচরণ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এক মায়ের প্রশ্নের জবাবে পারিবারিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ত্রাশিয়ুন এসব পরামর্শ দেন। ওই মা জানান, তাঁর আট বছর বয়সী ছেলে অত্যন্ত চঞ্চল, সহজে অন্য শিশুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না এবং প্রায়ই আক্রমণাত্মক আচরণ করে। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় সহপাঠীদের মারধরের কারণে তাকে বারবার স্কুলে যেতে হতো। তবে তখনও তার লেখাপড়ার ফল ভালো ছিল এবং সে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর তার পড়াশোনায় কিছুটা অবনতি দেখা দিয়েছে।

মা আরও জানান, তিনি স্কুলে গিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ছেলে তাতে আপত্তি জানায়। সে বলে, ‘তুমি স্কুলে এলে আমি লজ্জা পাই। সহপাঠীরা দেখলে নানা কথা বলবে।’

তিনি আরও বলেন, ছেলের এ সমস্যার কারণে তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসক তাকে হ্যালোপেরিডল ও মাছের তেলের সিরাপ দিয়েছেন। তবে শিশুর এমন আচরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তাঁরা কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

এ বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে ত্রাশিয়ুন বলেন, সর্বপ্রথম ‘দুষ্টু’ শব্দটি ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় অভিভাবকদের বলি, সন্তানকে “দুষ্টু” বলে চিহ্নিত করবেন না। এ শব্দটি নেতিবাচক অর্থ বহন করে এবং সন্তানের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও নেতিবাচক করে তোলে। বরং তাকে চঞ্চল বা খেলাপ্রিয় বলা যেতে পারে। এরপর তার আচরণের মূল কারণ শনাক্ত করে সে অনুযায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।’

স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন, তবে কৌশলে
ত্রাশিয়ুন বলেন, সন্তান যদি না চায় যে মা স্কুলে যান, তবুও অভিভাবকদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা উচিত। তবে এমন সময়ে স্কুলে যাওয়া ভালো, যখন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে থাকে। এতে শিশুর অস্বস্তি বা বিব্রতবোধ কম হবে এবং শিক্ষক-অভিভাবকের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা নির্বিঘ্নে করা যাবে।

শিশুর পুষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিন
তিনি বলেন, যেহেতু চিকিৎসক শিশুটিকে মাছের তেলের সিরাপ দিয়েছেন, তাই ধরে নেওয়া যায় যে তিনি পুষ্টিগত ঘাটতির বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন।

ত্রাশিয়ুনের মতে, বিশেষ করে ভিটামিন বি-জাতীয় উপাদানের ঘাটতি অনেক সময় শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে সে সহজেই উত্তেজিত বা রাগান্বিত হতে পারে, আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে এবং তার সহ্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। তাই শিশুর জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ দিন
তিনি বলেন, স্কুলের বাইরেও শিশুর সমবয়সী ও সমলিঙ্গের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এমন পরিবার নির্বাচন করা উচিত, যাদের মূল্যবোধ ও সামাজিক পরিবেশ ইতিবাচক। এতে শিশুর সামাজিক দক্ষতা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে।

টেলিভিশন ও মোবাইল ব্যবহারে সংযম প্রয়োজন
ত্রাশিয়ুন বলেন, শিশুদের অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় সীমিত করা উচিত।

তিনি বলেন, ডিজিটাল স্ক্রিনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার মস্তিষ্কের সামনের অংশের (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মস্তিষ্কের এ অংশ আচরণ নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা এবং মনোযোগ ধরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে। ফলে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুর মনোযোগ কমে যেতে পারে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দিতে পারে, সহ্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে এবং আক্রমণাত্মক আচরণও বৃদ্ধি পেতে পারে।

পরিবর্তন আসবে ধীরে ধীরে
ত্রাশিয়ুন বলেন, অভিভাবকদের তাৎক্ষণিক ফলের প্রত্যাশা করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা, নিয়মিত সকালের নাশতা খাওয়ানো, সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং স্ক্রিন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হলে ধীরে ধীরে শিশুর সমস্যার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি হতে পারে। তবে এর জন্য ধৈর্য ধরতে হবে; এক বা দুই সপ্তাহে পরিবর্তনের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।’

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha